"আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে"- অজয় ভট্টাচার্য- কথায় ও শচীন দেব বর্মনের সুরে গানটি শচীন দেব বর্মন রেকর্ড করেছিলেন সম্ভবত ১৯৪০-এর দশকেই। গানটি আমার বাবার খুব প্রিয় ছিল। বাবা অবসর সময়ে আপন মনে একটা প্রাচীন সিঙ্গল রীডের হারমোনিয়াম নিয়ে গাইতেন। অসম্ভব সুরেলা গলা ছিল। একটি ছোট্ট ক্যাসেট রেকর্ডারে গান রেকর্ড করতেন, শুনতেন আবার পুঁছে দিয়ে তাঁর উপরেই অন্য কোন গান রেকর্ড করতেন। এই গানটি যখন রেকর্ড করেছেন ঐ রেকর্ডারে, তখন তাঁর বয়স প্রায় ৮৫। ৯০ বছর বয়স পার করে ২০১৩ সালে আজকের দিনের সকালে তিনি চলে যান শেষ বারের মতো। সাধারনভাবে দেখলে তাঁর জীবন সাদামাটাই ছিল। কিন্তু সন্তান হিসাবে আমার তো একটা আবেগ থাকবেই। আর তাঁকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ তো সন্তানেরাই পায়। আমার জীবনের প্রেরণা ছিলেন আমার বাবা। যত দিন যাচ্ছে, তত মনে হচ্ছে তাঁর কাছ থেকে কত কি পেয়েছি, আরও কত কিছু পেতে পারতাম। আজ থেকে আট বছর আগে এমন সকালে নিশ্চুপে চলে গিয়েছিলেন। জীবনে অনেক লড়াই তাঁকে লড়তে হয়েছে। সেই লড়াই করেছিলেন নিশ্চুপেই। দেশ ভাগের পর আমার ঠাকুমা আর ছোট চার ভাইকে নিয়ে এপারে সংসারের হাল ধরেন। তাঁর বড় দাদা কর্মসূত্রে মালদহতে। আমার দাদু পূর্ববঙ্গে থেকে গিয়েছিলেন বহুদিন। বাবা কর্মক্ষেত্রেও প্রতিবাদী হয়ে অনেকভাবে কতৃপক্ষের হাতে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। আমরা কোনদিন বাড়িতে তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া দেখিনি। আমার কাকারাও বলেন, "এত প্রতিকুলতার মধ্যে আমাদের মেজদা কিভাবে সংসার টেনে নিয়ে গিয়েছেন, ভেবে আজ অবাক হই। মেধাবী ছাত্র হয়েও সব দায়িত্ব পালন করার জন্য নিজের উচ্চাশা রাখেননি। আমরা তাঁর কাছে পড়ে জীবনে এগিয়েছি।" মৃত্যুর আগে যখন ভোরবেলা হাস্পাতালে নিয়ে যাচ্ছি, এম্বুলেন্সে দেখলাম, ঠোঁট কামড়ে আছেন। বুঝলাম বুকে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু কোন শব্দ নেই। তিনি তো নিজে যন্ত্রণা সহ্য করতে শিখেছেন নিশ্চুপে। হাস্পাতালে নিয়ে যাওয়ার একটু পরেই চলে গেলেন। ৯০ বছর বয়স পার হয়ে তো আর লড়াই করা বোধ হয় সম্ভব ছিলনা। প্রদীপ নিভে গেল। আজ বাবার স্মৃতিতে তাঁর এই গানটি একটু পরিস্কার করে আবার আপলোড করলাম।